রাজধানীর ধানমন্ডিতে শ্লীলতাহানির অভিযোগের পর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ২৩ বছর বয়সী এক তরুণী। তাঁর অভিযোগ, ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তিনি তাৎক্ষণিক কোনো সহযোগিতা পাননি। বাধ্য হয়ে স্বজনকে ফোন করে ডাকেন তিনি। পরে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মারধরের ঘটনায় তাঁর স্বজন খালিদ হাসানকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তরুণীর প্রশ্ন, ‘নিজেকে রক্ষা করার জন্য অপরাধটা কি আমাদেরই হলো?’
গত বুধবার রাতে প্রথম আলোকে পাঠানো এক লিখিত বার্তায় নিজের অভিজ্ঞতা ও ক্ষোভের কথা তুলে ধরেন ওই তরুণী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি একই বক্তব্য প্রকাশ করেছেন বলে জানান।
শ্লীলতাহানির অভিযোগ, এরপর মারধরের ঘটনা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার দুপুরে ধানমন্ডির সাতমসজিদ সড়কে বাংলাদেশ আই হসপিটালের বিপরীত পাশে শহীদ আবদুল্লাহ আল মাসুদ ওরফে মাসুদ রানার (৪৮) বিরুদ্ধে ওই তরুণীকে অশালীনভাবে স্পর্শ করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার প্রতিবাদে তরুণীর স্বজন খালিদ হাসান (৩৫) ওই ব্যক্তিকে মারধর করেন এবং কান ধরে ওঠবস করান।
পরে পুলিশ শহীদ আবদুল্লাহকে আটক করে। শ্লীলতাহানির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে এক মাসের কারাদণ্ড দেন ঢাকা মহানগর পুলিশের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। অন্যদিকে, ফুটপাতে মারধরের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গত বুধবার খালিদ হাসানকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তাঁকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেন।
‘পুলিশ কোনো সাহায্য করেনি’
তরুণীর ভাষ্য, ঘটনার সময় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি। তিনি প্রথমে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নিয়ে গিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। কিন্তু পুলিশ তাঁকে মামলা করার পরামর্শ দেয়।
ওই সময় হাসপাতালে নিজের রোগী নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে মামলা করতে যাওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন ছিল বলে জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা দেখে শেষ পর্যন্ত আত্মরক্ষার জন্য স্বজনকে ডেকে আনতে বাধ্য হন।
তরুণীর দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে থানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি ও তাঁর স্বজন অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ওই ব্যক্তি যেতে রাজি না হওয়ায় একপর্যায়ে তাঁর স্বজন গায়ে হাত তোলেন। এখন সেই ঘটনার জন্য স্বজনকে কারাগারে যেতে হয়েছে বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর মুখ খুললেন তরুণী
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে আরেকজনকে মারধর করতে দেখা যায়। এ সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
তরুণী জানান, বিবাহিত হওয়ায় এবং ব্যক্তিগত জীবনে কোনো ধরনের সমস্যা এড়াতে তিনি এত দিন বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেননি। তবে ঘটনার বিস্তারিত না জেনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর স্বজনকে দোষারোপ করা হচ্ছে এবং তাঁর শাস্তি দাবি করা হচ্ছে—এমন পরিস্থিতিতে আর নীরব থাকতে পারেননি তিনি।
তাঁর অভিযোগ, ঘটনার প্রকৃত প্রেক্ষাপট সামনে না আসায় তাঁকে নতুন করে হয়রানি ও অস্বস্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। এ কারণে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
মানসিক অসুস্থতা কি কাউকে এমন আচরণের অধিকার দেয়?
তরুণীর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি মানসিক রোগী বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে তাঁর প্রশ্ন, কেউ মানসিক অসুস্থতায় ভুগলেও কি অন্য কাউকে অশালীনভাবে স্পর্শ করার অধিকার পান?
একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, অভিযোগের শিকার ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার প্রতিবাদ করার দায়িত্ব কি কেবল তাঁর নিজের ওপরই বর্তাবে? পুলিশ পাশে না দাঁড়ালে একজন নারী কোথায় যাবেন, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
তাঁর মতে, একজন ব্যক্তি অভিযোগের শিকার হওয়ার পর ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে যদি উল্টো সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হন, তাহলে তা উদ্বেগজনক। তবে ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে আইন নিজের হাতে নেওয়ার বিষয়টিও আইনি প্রশ্নের জন্ম দেয়।
ঘটনাস্থলে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনাটি নিয়ে সমালোচনার মধ্যে ধানমন্ডি থানার এএসআই আবদুল হাইকে কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব প্রথম আলোকে জানান, ঘটনাস্থলে এএসআই আবদুল হাইয়ের দায়িত্ব ছিল। সেখানে থাকা অন্য দুই পুলিশ সদস্য পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টের সদস্য হওয়ায় তাঁদের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না বলে জানান।
ঘটনার ভিডিও প্রকাশকারী ব্যক্তির সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন তরুণী। তাঁর দাবি, নিজের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ভিডিওটি সরিয়ে নিতে অনুরোধ করেছিলেন তিনি। তবে ভিডিও প্রকাশকারী ব্যক্তি তাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।
‘কাল অন্য কারও সঙ্গে এমন হলে কী হবে?’
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তরুণী প্রশ্ন করেছেন, একজন নারীকে কেন নিজের সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে এভাবে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে? নিজের নিরাপত্তা চাওয়া কি তাঁর ভুল ছিল? তাঁকে রক্ষা করতে গিয়ে স্বজনের কারাদণ্ড হওয়ায় এখন তিনি নিজেকে কতটা নিরাপদ ভাববেন?
তাঁর আশঙ্কা, এমন ঘটনা ভবিষ্যতে অন্য নারীর সঙ্গেও ঘটতে পারে। তখন পরিবারের সদস্যরা প্রতিবাদ করতে এগিয়ে এলে তাঁদেরও কি একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে?
তরুণীর ভাষায়, ‘যে অপরাধ করে আর যে অপরাধ সহ্য করে—দুজনই কি সমান অপরাধী?’
নিজের নিরাপত্তা, পুলিশের দায়িত্ব এবং প্রতিবাদ করতে গিয়ে আইনের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি যে প্রশ্নগুলো করেছেন, সেগুলোর জবাব ও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চান তিনি।
