যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ—প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গণিত শেখার ভিত্তি তৈরি হয় এই চারটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। নিয়মিত অনুশীলন, শিক্ষকের সহায়তা ও উপযুক্ত শিক্ষা উপকরণের মাধ্যমে শিশুরা ধীরে ধীরে এসব বিষয়ে দক্ষ হয়ে ওঠে। এবার সেই শেখার প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন নেদারল্যান্ডসের গবেষকেরা।
তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে এআই-সমর্থিত শিখনপ্রযুক্তি ব্যবহার করলে শিশুদের পাটিগণিতের দক্ষতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে বড় বিদ্যালয় এবং আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য এ প্রযুক্তি বাড়তি সুবিধা তৈরি করতে পারে।
তিন বছরে গবেষণায় অংশ নেয় প্রায় ৮ হাজার শিশু
নেদারল্যান্ডসের রাডবাউড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় গবেষক ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ গবেষণা পরিচালনা করেন। এতে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণির মোট ৭ হাজার ৮৮৫ শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে ৪ হাজার ৬০৩ জন, অর্থাৎ ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে এআই-সমর্থিত শিখনপ্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পায়। অন্যদিকে বাকি ৩ হাজার ২৮২ জন প্রচলিত পদ্ধতিতে পড়াশোনা করে।
গবেষণার জন্য আলাদা কোনো পাঠ্যবই ব্যবহার করা হয়নি। শিক্ষার্থীরা আগের মতোই ট্যাবলেট কম্পিউটারে অনুশীলন করেছে। তবে একদল শিক্ষার্থীর জন্য ব্যবহৃত ট্যাবলেটে যুক্ত ছিল এআইভিত্তিক শিখনপ্রযুক্তি, যা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও শেখার অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করত।
ভুল করলে সহজ অঙ্ক, ভালো করলে কঠিন অনুশীলন
এআইভিত্তিক এই পদ্ধতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি শিশুর শেখার অগ্রগতি অনুযায়ী অনুশীলনের ধরন ও কঠিনতার মাত্রা পরিবর্তিত হয়।
গবেষকেরা দেখেছেন, কোনো শিক্ষার্থী ধারাবাহিকভাবে অনুশীলন সঠিকভাবে সম্পন্ন করলে তার সামনে তুলনামূলক কঠিন অঙ্ক দেওয়া হয়। বিপরীতে, ভুল করলে তার জন্য সহজতর অঙ্ক ও অনুশীলনের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে শিক্ষার্থী নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।
এ ব্যবস্থায় শিক্ষকেরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে তাঁরা শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। কোন শিক্ষার্থী ভালো করছে, কে পিছিয়ে পড়ছে এবং কার বাড়তি সহায়তা প্রয়োজন—এসব তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষক প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারেন।
প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় ইতিবাচক ফল
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, সাধারণ পাঠদানের তুলনায় এআই-সমর্থিত শিখনপ্রযুক্তি ব্যবহারে শিক্ষার্থীদের পাটিগণিতের দক্ষতা বাড়ার ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। যদিও দুই দলের অগ্রগতির পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে খুব বড় ছিল না, সামগ্রিক ফলাফলে এআই ব্যবহারের সুবিধা লক্ষ করা গেছে।
বিশেষ করে চতুর্থ শ্রেণিতে ওঠার পর শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির গতি কিছুটা কমলেও এআই ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক অগ্রগতি তুলনামূলক বেশি ছিল বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্যও সম্ভাবনা
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব বিদ্যালয়ে আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, সেখানে এআইভিত্তিক শিখনপ্রযুক্তি ব্যবহারে গণিত শেখার অগ্রগতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগের বৈষম্য কমাতে সহায়তা করতে পারে। কারণ, শ্রেণিকক্ষে সবার শেখার গতি এক রকম না হলেও এআই শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী অনুশীলনের সুযোগ তৈরি করে।
বড় বিদ্যালয়গুলোতেও এ প্রযুক্তির সুফল বিশেষভাবে লক্ষ করা গেছে। এসব বিদ্যালয়ে একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থীকে পড়ানোর কারণে প্রত্যেকের শেখার দুর্বলতা আলাদাভাবে চিহ্নিত করা শিক্ষকদের জন্য কঠিন হতে পারে। এআইয়ের সহায়তায় শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা সহজ হওয়ায় দুর্বল শিক্ষার্থীদের দিকে বাড়তি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
শিক্ষকের বিকল্প নয় এআই
শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের সম্ভাবনা থাকলেও গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এটি কোনোভাবেই শিক্ষকের বিকল্প হতে পারে না। প্রযুক্তিটি মূলত সংরক্ষিত তথ্য ও শিক্ষার্থীদের অনুশীলনের ফলাফলের ভিত্তিতে কাজ করে। অন্যদিকে একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ এবং শেখার ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো বুঝতে পারেন।
এ কারণে এআইকে শিক্ষকের সহায়ক হিসেবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকেরা। ড্যাশবোর্ড থেকে পাওয়া তাৎক্ষণিক তথ্যের সাহায্যে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারবেন।
তবে এ প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে শিক্ষার্থীদের শেখার উন্নতি ঘটাবে, সে বিষয়েও পরিকল্পিত উদ্যোগ জরুরি।
শিক্ষার মান উন্নয়নে নতুন দিগন্ত
গবেষণাটির ফলাফল গত মাসে এলসেভিয়ারের প্রকাশিত Learning and Instruction সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণার উপসংহারে বলা হয়েছে, সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি প্রাথমিক স্তরে গণিত শেখার নির্ভরযোগ্য সহায়ক হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য কমাতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রাথমিক শিক্ষায় এআইয়ের এমন ব্যবহার ভবিষ্যতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে শিক্ষকের সক্রিয় অংশগ্রহণ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের উপযোগী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
